ইসলামে বিয়ের গুরুত্ব: কুরআন ও হাদিসের আলোকে
৩ নভেম্বর, ২০২৬
- #ইসলামে বিয়ের গুরুত্ব
- #ইসলামিক বিয়ে
- #বিয়ে সুন্নত
- #মুসলিম বিয়ে
ইসলামে বিয়ে কেবল দুজন মানুষের একসঙ্গে থাকার সামাজিক চুক্তি নয়; এটি আল্লাহর একটি নিদর্শন, নবীজির (সা.) সুন্নত এবং একটি পবিত্র অঙ্গীকার। বিয়ের মাধ্যমে একজন মুসলিম নিজের চরিত্রকে হেফাজত করেন, পরিবার গড়ে তোলেন এবং দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি দায়িত্ব পালনকে ইবাদতে পরিণত করার সুযোগ পান।
দ্রষ্টব্য: এই লেখা সাধারণ আলোচনা। নির্দিষ্ট মাসআলা বা ব্যক্তিগত পরিস্থিতির জন্য একজন বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিন।
১. বিয়ে আল্লাহর নিদর্শন
আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে তাঁর নিদর্শনগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন:
"আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা রুম, আয়াত ২১)
এই আয়াতে বিয়ের তিনটি মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট: প্রশান্তি (সাকিনাহ), ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) এবং দয়া (রাহমাহ)। একটি ইসলামি সংসারের ভিত্তি এই তিনটি গুণ।
২. বিয়ে নবীজির (সা.) সুন্নত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিয়েকে নিজের সুন্নত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিছু সাহাবি যখন ইবাদতের জন্য বিয়ে না করার সংকল্প করেছিলেন, তখন তিনি জানিয়ে দেন যে তিনি নিজে বিয়ে করেন, এবং যে তাঁর সুন্নত থেকে বিমুখ হয়, সে তাঁর দলভুক্ত নয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০৬৩)
অর্থাৎ ইসলামে বৈরাগ্য বা সংসারবিমুখতাকে আদর্শ হিসেবে দেখা হয় না; বরং সংসারের দায়িত্ব পালন করেই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
৩. চরিত্র ও লজ্জাশীলতার হেফাজত
রাসুলুল্লাহ (সা.) তরুণদের উদ্দেশে বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যার বিয়ের সামর্থ্য আছে সে যেন বিয়ে করে, কারণ এটি দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে। (সহিহ বুখারি ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম ১৪০০)
একটি হাদিসে বিয়েকে দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করা হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে, এবং বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে বলা হয়েছে। (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)
আলেমগণ বলেন, ব্যক্তির অবস্থাভেদে বিয়ের বিধান ভিন্ন হতে পারে — যেমন সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও গুনাহে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বিয়ে করা আরও জরুরি হয়ে পড়ে।
৪. বিয়ে একটি দৃঢ় অঙ্গীকার
কুরআনে বিয়ের চুক্তিকে "মীসাকান গালীযা" বা দৃঢ় অঙ্গীকার বলা হয়েছে। (সূরা নিসা, আয়াত ২১) তাই বিয়েকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি দুজন মানুষের মধ্যে, এবং আল্লাহর সামনে, দায়িত্ব ও বিশ্বস্ততার প্রতিশ্রুতি।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ, তা বোঝাতে কুরআনে বলা হয়েছে, তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৭) পোশাক যেমন আবৃত করে, সৌন্দর্য দেয় ও সুরক্ষা দেয় — স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের জন্য তেমন।
৫. জীবনসঙ্গী নির্বাচনে দ্বীনদারিকে প্রাধান্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাধারণত চারটি বিষয় দেখে নারীকে বিয়ে করা হয়: সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারি; তুমি দ্বীনদারকে প্রাধান্য দাও। (সহিহ বুখারি ৫০৯০, সহিহ মুসলিম ১৪৬৬)
এই মানদণ্ড পাত্রের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। সৌন্দর্য বা সম্পদ বাদ দিতে বলা হয়নি, কিন্তু অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে চরিত্র ও তাকওয়াকে, কারণ দীর্ঘ দাম্পত্যে সেটাই টিকে থাকে।
৬. পাত্র-পাত্রীর সম্মতি অপরিহার্য
ইসলামে জোর করে বিয়ে দেওয়ার কোনো স্থান নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বিবাহিত-পূর্ব নারীর (সাইয়্যিবা) স্পষ্ট মত এবং কুমারীর অনুমতি ছাড়া তাদের বিয়ে দেওয়া যাবে না। (সহিহ বুখারি ৫১৩৬)
একই সঙ্গে ইসলাম বিয়েতে পরিবার ও অভিভাবকের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেয়। অভিভাবকের অভিজ্ঞতা ও পাত্র-পাত্রীর সম্মতি — দুটো মিলেই একটি বরকতময় বিয়ের সূচনা হয়।
৭. মোহর স্ত্রীর অধিকার
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমরা নারীদের তাদের মোহর খুশিমনে দিয়ে দাও। (সূরা নিসা, আয়াত ৪) মোহর স্ত্রীর একান্ত অধিকার, কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী মোহর নির্ধারণ করা এবং তা পরিশোধ করা স্বামীর দায়িত্ব।
অন্যদিকে কনেপক্ষের কাছ থেকে যৌতুক বা শর্তযুক্ত উপহার দাবি করার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই, এবং বাংলাদেশের আইনেও তা দণ্ডনীয় অপরাধ।
৮. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব
কুরআনে স্ত্রীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সূরা নিসা, আয়াত ১৯) আর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা তাদের স্ত্রীদের কাছে উত্তম। (জামে তিরমিজি ১১৬২)
ভরণপোষণ, সম্মান, ধৈর্য, পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, একে অপরের দ্বীনদারিতে সাহায্য করা — এসবই দাম্পত্যের দায়িত্ব। নিয়ত বিশুদ্ধ থাকলে সংসারের এই প্রতিদিনের কাজগুলোও সওয়াবের কারণ হয়।
৯. সমাজকে বিয়ে সহজ করার আহ্বান
কুরআনে সমাজকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিয়ে দাও; তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। (সূরা নূর, আয়াত ৩২)
অথচ আজ বিশাল খরচ, লোক দেখানো আয়োজন আর অবাস্তব শর্তের কারণে অনেকের জন্য বিয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে। বিয়েকে সহজ ও সাদামাটা রাখা এই আয়াতের শিক্ষারই প্রতিফলন। এ নিয়ে ব্যবহারিক পরামর্শ পাবেন সাদামাটা বিয়ে: খরচ কমিয়ে সুন্দর আয়োজনের ১০টি উপায় লেখায়।
শেষ কথা: ইসলামে বিয়ে একই সঙ্গে ইবাদত, সুন্নত ও দায়িত্ব। দ্বীনদারিকে প্রাধান্য দিয়ে, দুজনের সম্মতিতে এবং সহজ আয়োজনে যে সংসারের শুরু, তাতেই প্রশান্তি, ভালোবাসা ও রহমতের আশা করা যায়। দ্বীনদার জীবনসঙ্গী খুঁজতে বিবাহ-তে ইসলামিক বায়োডাটা দেখুন, অথবা নিজের বায়োডাটা তৈরি করুন।