← সকল লেখা

বিয়ের আগে যে আইনি বিষয়গুলো জানা জরুরি

৩০ অক্টোবর, ২০২৬

  • #বিয়ের আইন বাংলাদেশ
  • #বিয়ের বয়স
  • #বিয়ে নিবন্ধন
  • #যৌতুক নিরোধ আইন
  • #কাবিননামা

বিয়ের প্রস্তুতিতে আমরা অনুষ্ঠান, কেনাকাটা আর অতিথি তালিকা নিয়ে যতটা ভাবি, আইনি দিক নিয়ে ততটা ভাবি না। অথচ এই বিষয়গুলো ঠিক না থাকলে ভবিষ্যতে দুজনেরই — বিশেষ করে নারীর — অধিকার রক্ষা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

দ্রষ্টব্য: এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য, আইনি পরামর্শ নয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

১. বিয়ের ন্যূনতম বয়স

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী ছেলের বয়স ২১ এবং মেয়ের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হলে সেই বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয় এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনে "বিশেষ প্রেক্ষাপটে" আদালতের নির্দেশে ব্যতিক্রমের একটি বিধান থাকলেও সাধারণ নিয়ম এই বয়সসীমাই।

বিবাহ-তে বায়োডাটা অনুমোদনের সময় এই বয়সসীমা মেনে চলা জরুরি। বায়োডাটায় জন্মতারিখ সঠিক দিন, এবং প্রস্তাব পেলে অপর পক্ষের বয়সও যাচাই করুন।

২. বিয়ের নিবন্ধন: ধর্মভেদে নিয়ম আলাদা

  • মুসলিম: নিবন্ধন বাধ্যতামূলক (মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন, ১৯৭৪)। নিবন্ধন না করা দণ্ডনীয়, যদিও এতে বিয়ে অবৈধ হয় না। নিবন্ধন করেন স্থানীয় নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী)।

  • হিন্দু: নিবন্ধন ঐচ্ছিক (হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন, ২০১২)। নিবন্ধন করেন হিন্দু বিবাহ নিবন্ধক।

  • খ্রিস্টান: প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিয়ের সময় গির্জা বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিবন্ধন।

হিন্দু বিয়েতে নিবন্ধন ঐচ্ছিক হলেও তা করে রাখা ভালো। নিবন্ধনের সনদ ভবিষ্যতে ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার, পাসপোর্ট বা ভিসার মতো কাজে বিয়ের প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে।

ভিন্ন ধর্মের দুজনের বিয়ের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া আলাদা ও জটিল হতে পারে; সেক্ষেত্রে অবশ্যই আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

৩. কাবিননামা মন দিয়ে পড়ুন

মুসলিম বিয়ের কাবিননামা একটি আইনি দলিল। এতে দেনমোহরের পরিমাণ, কতটা নগদ আর কতটা বাকি, এবং স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে কি না — এসব লেখা থাকে। সই করার আগে প্রতিটি ঘর পাত্র-পাত্রী নিজে পড়ে দেখুন; ফাঁকা ঘর রেখে সই করবেন না। নিবন্ধনের পর কাবিননামার সত্যায়িত কপি সংগ্রহ করে নিরাপদে রাখুন।

৪. যৌতুক: দাবি, দেওয়া ও নেওয়া — সবই অপরাধ

যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী যৌতুক দাবি করা, দেওয়া বা নেওয়া — তিনটিই দণ্ডনীয়। আইনের ৩ ধারায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌতুক দাবি করার শাস্তি সর্বনিম্ন ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড।

মনে রাখুন, দেনমোহর ও ভরণপোষণ স্ত্রীর আইনি অধিকার — এগুলো যৌতুক নয়। অন্যদিকে "উপহার" বা "খুশি হয়ে দেওয়া"র নামে আসবাব, গাড়ি বা টাকার শর্ত দেওয়া যৌতুকেরই আরেক রূপ। আলাপের কোনো পর্যায়ে এমন দাবি উঠলে সেটিকে সতর্কসংকেত হিসেবে দেখুন।

৫. দুজনের স্বাধীন সম্মতি

বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র ও পাত্রী দুজনেরই স্বাধীন সম্মতি অপরিহার্য। পারিবারিক বা সামাজিক চাপে কাউকে বিয়েতে রাজি করানো শুধু অন্যায় নয়, তা সম্পর্কের ভিত্তিকেই দুর্বল করে। বিবাহ-তে প্রতিটি বায়োডাটা অভিভাবকের সম্মতি যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া হয়; কিন্তু চূড়ান্ত "হ্যাঁ" আসতে হবে যাঁদের বিয়ে, তাঁদের কাছ থেকে।

বিয়ের আগে একটি ছোট চেকলিস্ট

  • দুজনের বয়স আইনি সীমা পূর্ণ করেছে কি না যাচাই

  • জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদের কপি প্রস্তুত

  • নিবন্ধক বা কাজী নির্ধারণ

  • কাবিননামা বা নিবন্ধন ফর্মের প্রতিটি ঘর পড়ে দেখা

  • দেনমোহর নিয়ে দুই পরিবারের লিখিত সমঝোতা

  • কোনো যৌতুক বা শর্তযুক্ত উপহারের দাবি নেই, তা নিশ্চিত করা

  • নিবন্ধনের সনদের সত্যায়িত কপি সংগ্রহ


শেষ কথা: আইন জানা মানে অবিশ্বাস নয়; এটি দুজনের প্রতি দায়িত্বশীলতা। সুন্দর সূচনার জন্য আইনি ভিত্তিটাও শক্ত হোক। জীবনসঙ্গীর খোঁজ শুরু করতে বিবাহ-তে বায়োডাটা দেখুন।

তথ্যসূত্র